সিলেটের সীমান্তে অপরাধের নয়া গডফাদার স্টেলিন তারিয়াং: নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, নেটওয়ার্ক ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ঢাল
সিলেট বুলেটিন ডেক্সঃ সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তজুড়ে এখন এক তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের নাম স্টেলিন তারিয়াং। ভারত থেকে অবৈধ পণ্য চোরাচালান, অস্ত্র ও বিস্ফোরক কারবার, মাদক পাচার, মানব পাচার এবং পরিবেশ ধ্বংস করে জাফলং ও পিয়াইন নদী থেকে রাতের আঁধারে কোটি কোটি টাকার বালু ও পাথর উত্তোলনের পুরো সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁর হাতে।
গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল চাবিকাঠি চলে যায় স্টেলিংয়ের দখলে, যেখানে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন সীমান্ত অপরাধের নতুন ‘গডফাদার’ হিসেবে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন সংগ্রামপুঞ্জি এলাকার বাসিন্দা স্টেলিং তারিয়াং সিলেট জেলা বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। যদিও তার নিজ বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে। তাঁর ফুফু নিরোলা ধংসন জাফলং অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী নারী যাকে স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মানসূচক ‘খাসিয়া রানি’ বলে ডেকে থাকেন।
পারিবারিক এই প্রভাব ও রাজনৈতিক আশীর্বাদকে ঢাল বানিয়ে স্টেলিং সীমান্ত জুড়ে অপরাধের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে সিলেট সীমান্তে চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই রাতারাতি পুরো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের একশ্রেণির নেতার হাতে।
জেলা বিএনপির প্রভাবশালী এক শীর্ষ নেতার ছত্রছায়ায় স্টেলিং তারিয়াং সীমান্তের অবৈধ সাম্রাজ্য নিজের কবজায় নেন। অভিযোগ রয়েছে, একসময়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও সুযোগ সন্ধানী অপরাধী চক্র যেমন খায়রুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম রাতারাতি বিএনপি সেজে স্টেলিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা গড়ে তুলেছে। এমনকি স্টেলিং তারিয়াং-এর সুরম্য প্রাসাদে অভিযুক্ত এসব অপরাধীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করতে দেখা গেছে।
এই সুবিধাবাদী চক্রটি স্টেলিংনের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে গোয়াইনঘাটের প্রতাপপুর, গুচ্ছগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন এবং রাতের আঁধারে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। ভারতের মেঘালয় অংশে শক্তিশালী পারিবারিক নেটওয়ার্ক, আত্মীয়তা এবং খাসিয়া সামাজিক যোগাযোগকে চরমভাবে ব্যবহার করছেন স্টেলিং। দুই দেশের সীমান্তে খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে কোনো অপরাধ সংঘটনের পর বা আইনি চাপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে স্টেলিং অনায়াসে সীমান্ত পার হয়ে মেঘালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি ‘দ্বৈত নাগরিক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। ভারতের মেঘালয়ে খাসিয়াদের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত শাসন ব্যবস্থা থাকায় তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সীমান্তকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাড়তি সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা ভোগ করছেন। স্টেলিংয়ের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট শুধু সুপারি, চিনি, কসমেটিকস কিংবা গরুর সীমান্ত বাণিজ্যেই সীমিত নয়। এই রুটে ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, কসমেটিকস ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য প্রবেশ করছে।
একই সাথে সীমান্ত পার করে মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, যার পেছনে মনসুর মেম্বারসহ একাধিক সহযোগী কাজ করছে। পাশাপাশি জাফলং ও পিয়াইন নদী থেকে কোটি টাকার বালু-পাথর উত্তোলনের চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটও স্টেলিংয়ের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়। স্থানীয় সাংবাদিক কিংবা সাধারণ মানুষ তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁদের ওপর লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালানো হয়। সীমান্ত এলাকায় স্টেলিং তারিয়াং-এর এই অপরাধ নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখতে মাঠপর্যায়ে একাধিক বিতর্কিত মুখ সক্রিয় রয়েছে।
এদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম-আহ্বায়ক টিটন মল্লিক।
এছাড়াও স্থানীয় তারিকুল, ফারহান, মনসুর মেম্বার, শারুখ, আলামিন এবং কালা ওরফে কালুসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি মাঠপর্যায়ে এই অপরাধ বলয় সক্রিয় রাখছে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করে স্টেলিং তারিয়াং দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
তাঁর ঘরের বা এলাকার আশপাশে চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড হতে পারে, তবে তিনি কখনোই সেগুলোতে জড়ান না বা কাউকে আশ্রয় দেন না। পারিবারিক সুনামের কারণে অনেকে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাঁর নাম বিক্রি করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, স্টেলিন তারিয়াং বা তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবিলম্বে যথাযথ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেটের জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী জাবের সাদেক সীমান্তে চোরাচালানের সত্যতা স্বীকার করে জানান, অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সীমান্তে কোনো চোরাচালানচক্র কিংবা তাদের মদদদাতাদের আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে সম্প্রতি দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি দৈনিকে স্টালিং তারিয়াংকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সিলেট বিএনপির মধ্যে শুরু হয় তোলপাড়, নিজের টাকা দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা অনলাইনে পসংবাদের প্রতিবাদ প্রকাশের পাশাপাশি ঐ গণমাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশের জন্য ৫ লাখ টাকা নিয়ে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন।
কিন্ত সেই গণমাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশ না করায় তিনি নিজের বলয়ের কিছু লোক নিয়ে ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় লোকজন এ প্রতিবেদককে গতকাল নিশ্চিত করেন।
সূত্র – দৈনিক পর্যবেক্ষণ