শ্রীমঙ্গলে অপহরণের পর সাক্ষীর লাশ উদ্ধার, পরিবারের অভিযোগ পূর্ব শত্রুতার জেরে হত্যাকাণ্ড
কামাল খান :: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনায় অপহরণের পর মোঃ টিপু মিয়া নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত টিপু মিয়া একটি চলমান ডাকাতির মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন বলে জানা গেছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মে ২০২৫ রাত প্রায় ৯টার দিকে টিপু মিয়াকে তার নিজ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় ২-৩ জন ব্যক্তি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা টিপু মিয়াকে বাইরে গিয়ে কিছু কথা বলার কথা বলে নিয়ে যায়, এবং তিনি তাদের সঙ্গে বের হয়ে যান। কিন্তু এরপর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি।
পরিবার জানায়, রাত থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। তাকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং পরদিন সকালে তারা থানায় গিয়ে একটি অভিযোগ করার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করে যে তারা বিষয়টি দেখছে এবং তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।
তবে এরই মধ্যে ২৪ মে ২০২৫ সকাল প্রায় ১১টার দিকে, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর আসে যে একটি বড় বস্তার ভেতরে একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজন লোক একটি বড় বস্তা (ব্যাগ) সন্দেহজনক অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন যে এর ভেতরে কোনো ব্যক্তির মরদেহ থাকতে পারে। পরে তারা বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তার ভেতর থেকে টিপু মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে।
জানা যায়, টিপু মিয়া নভেম্বর ২০২২ সালে আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন, যা আদালতে রেকর্ড করা হয়। এর পর থেকেই তাকে তার সাক্ষ্য পরিবর্তন বা বক্তব্য বদলানোর জন্য আসামী এবং সন্ত্রাসীরা নিয়মিত হুমকি দিতে থাকে।
নিহতের পরিবার দাবি করেছে, সাক্ষ্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জেরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মামলার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি মুহিবুর রহমান শেতুর সহযোগী সন্ত্রাসীরাই এই ঘটনা ঘটিয়েছে এবং এটি মূলত তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
নিহতের ভাই বলেন, “আমার ভাই নভেম্বর ২০২২ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিল। এরপর থেকেই তাকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল যেন সে তার বক্তব্য পরিবর্তন করে। ২৩ মে রাতে ২-৩ জন লোক এসে তাকে ডেকে নিয়ে যায়, তারপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। আমরা থানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই সকালে তার লাশ পাওয়া যায়। শেতু সরাসরি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তার লোকজনই আমার ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পর থেকেও আমাদেরকে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমরা পুলিশ বা অন্য কারও কাছে কিছু না বলি। আমরা এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি।”
পুলিশ জানায়, মরদেহটি গ্রামের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি ঝোপঝাড় এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অপহরণের কিছু সময়ের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
স্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “আমরা তথ্য পেয়েছি যে তাকে বাজার এলাকা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি জোর করে নিয়ে যায়। পরে তার মরদেহ একটি দূরবর্তী ঝোপঝাড় এলাকায় পাওয়া যায়। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্ব বিরোধ এবং সাক্ষী হিসেবে তার ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ হত্যাকাণ্ড আবারও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এদিকে নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের দাবি জানালেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। শেতু সরাসরি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তার লোকজনই আমার ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।”