শিরোনাম
সিলেট সিটি অনলাইন প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি পদ থেকে রাজন আহমেদ আরিয়ানের স্বেচ্ছায় অব্যাহতি।ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ ছাতকে স্ত্রী হ’ত্যাকা’রী আমির আলী-কে সিলেট থেকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে  দোয়ারাবাজারে জঙ্গলে বটবৃক্ষের নিচে ‘আস্তানা’ ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক   মোবাইল ফোনে প্রেম: গভীর রাতে সুনামগঞ্জে নাবালক-নাবালিকাকে উদ্ধার করে পরিবারের জিম্মায় দিল পুলিশ গোয়াইনঘাটে মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত, ৭ সদস্যের বাস্তবায়ন কমিটি গঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বাউলদল জৈন্তাপুর উপজেলা শাখার ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন। সিলেটের সীমান্ত জনপদ জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে আসা কুটি কুটি টাকার চোরাচালান-মাদকের ভয়াল থাবা জৈন্তাপুরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার, থানায় মিথ্যা জিডি এবং হুমকি ও হত্যার ভয়ভীতি প্রদর্শন : ৩ জন নামীয় আসামি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেছেন সাংবাদিক সাজু  কানাইঘাটে সুরমা নদী থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন: জনমনে আতঙ্ক  জৈন্তাপুরে ‘পূর্ব দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন।
শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

সিলেটের সীমান্ত জনপদ জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে আসা কুটি কুটি টাকার চোরাচালান-মাদকের ভয়াল থাবা

স্টাফ রিপোর্টার / ৩৫ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

50

# ‘ব্রয়লার সেলিম’ সিন্ডিকেটের মরণনেশা ও বখরা সাম্রাজ্যের অন্দরে।

# স্টেডিয়াম থেকে বস্তি, যেখানে গড়ে উঠেছে মাদকের নিরাপদ আস্তানা।

# ‘টোকেন সিস্টেম’ ও মাসোহারা, যেভাবে চলে বখরা সাম্রাজ্য।

# আইনি লুপহোল ও কাস্টমস নিলামের অদ্ভুত চক্র।

# ডিবির হাওর ও পাহাড়ি ছড়া, চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট রুট।

# সংবাদ প্রকাশ হলেই আসে মামলা-হামলার হুমকি 

 

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলা। পাহাড়, হাওর আর ঐতিহাসিক জৈন্তা রাজবাড়ির সৌন্দর্যে ঘেরা এই শান্ত জনপদটি এখন গভীর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। গত চার মাস ধরে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাবের ব্যাপক তৎপরতায় একের পর এক জব্দ হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য, দামি স্মার্টফোন, কসমেটিকস এবং অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রাখা মরণ নেশা মাদক। তবে একের পর এক চালান ধরা পড়লেও সীমান্তবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ কমছে না। কারণ, এই চোরাচালান ও মাদক বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছে এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যার মূল হোতা স্থানীয়ভাবে ‘ব্রয়লার সেলিম’ নামে পরিচিত সেলিম আহমেদ। সাম্প্রতিক সময়ে ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বালীপাড়া এলাকার একটি গোডাউন থেকে ১৬ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের ৭৫ বস্তা ভারতীয় জিরার বিশাল চালান জব্দের পর এই সিন্ডিকেটের পুরো নেটওয়ার্কের গা শিউরে ওঠা তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্ত এলাকার এই বিশাল চোরাচালান চক্রটি এক রাতে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক দীর্ঘ ইতিহাস। নিজেকে স্থানীয় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছে সেলিম আহমেদ। তবে এই সেলিমের সাথে যুবদলের কোন সম্পর্ক নেই বলে জানান অনেক নেতা। তার নেই কোন পদপদবী। স্থানীয় সচেতন মহলের স্পষ্ট অভিযোগ, এই রাজনৈতিক তকমা মূলত সীমান্তে অবাধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর একটি শক্তিশালী আইনি ঢাল। ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনীতির সমীকরণ যাই হোক না কেন, সেলিম সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় উপ-গ্রুপগুলোর সাথে এক অদৃশ্য সুসম্পর্ক বজায় রাখে, যা তার চোরাচালানের রুটগুলোকে বছরের পর বছর সচল রাখতে সহায়তা করে আসছে।

‘ব্রয়লার সেলিম’ নামটির উৎপত্তি মূলত ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে ব্রয়লার মুরগি ও চুনো মাছের পোনা আমদানির মাধ্যমে হলেও, বর্তমানে তার সাম্রাজ্য টেক্সটাইল থেকে শুরু করে মরণনেশা মাদক পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত সুসংগঠিত চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেলিম আহমেদ নিজে কখনোই সীমান্ত স্পটে গিয়ে মালামাল বহন করে না। তার রয়েছে একঝাঁক বিশ্বস্ত সহযোগী, যারা ভিন্ন ভিন্ন জোনের দায়িত্ব পালন করেন।

আমির (মিনি স্টেডিয়াম আস্তানা): সেলিমের এই সেকেন্ড-ইন-কমান্ড জৈন্তাপুর মিনি স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় সরকারি কোনো অনুমতি ছাড়াই অবৈধ ভাবে আস্তানা গেড়ে বসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেলিমের সরাসরি নির্দেশে সে পুরো স্টেডিয়াম এলাকাকে মাদক বিক্রির নিরাপদ জোনে পরিণত করেছে এবং স্থানীয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন ও নিষিদ্ধ ট্যাবলেট ইয়াবা, হেরাইন, মদের খুচরা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে।

জেবু (শীর্ষ মাদক সরবরাহকারী): সেলিমের সরাসরি অর্থায়নে ভারত থেকে আসা ইয়াবা, ফেন্সিডিল এবং ভয়ঙ্কর মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) সিলেটের বিভিন্ন পয়েন্টে সরবরাহ করার মূল দায়িত্ব এই জেবুর কাঁধে।

আলী গং (জালাল বস্তির পাহারাদার): জালাল বস্তি এলাকার এই অপরাধী চক্রটি সেলিমের মাদকের গোডাউন পাহারা দেওয়া, লাইনম্যান হিসেবে কাজ করা এবং প্রশাসনের গতিবিধির ওপর নজর রাখার দায়িত্ব পালন করে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও দুর্গম রুটসমূহ: ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি, খাসিয়া পুঞ্জি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে থাকা ভারতীয় খাসিয়া চোরাকারবারিদের সাথে সেলিমের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ওপার থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেলেই মূলত জিরার মতো বড় বড় চালান বাংলাদেশে পুশ করা হয়। চোরাকারবারিরা যাতায়াতের জন্য জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা সংলগ্ন পাহাড়ি ছড়া এবং সীমান্ত নদীগুলোকে প্রধান ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। বর্ষাকালে দুর্গম হাওর এলাকায় নৌকা দিয়ে এবং শীতকালে পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে পণ্য আনা হয়। এবারের জিরার চালানটিও এই রুটগুলোর কোনো একটি ব্যবহার করে এনে ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বালিপাড়া গ্রামের জমির উদ্দিনের বাড়িতে বা গোডাউনে মজুত করা হয়েছিল, যা জৈন্তাপুর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোঃ উসমান গনীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এছাড়া ডিবির হাওর ও ঐতিহ্যবাহী জৈন্তা রাজবাড়ী সংলগ্ন সীমান্ত এলাকাগুলো ব্যবহার করে উচ্চ মুনাফার মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়, যা পরবর্তীতে জালাল বস্তির নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে সিলেটের মূল শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

‘টোকেন সিস্টেম’ ও বখরা বণ্টনের অদৃশ্য অর্থায়ন: সীমান্তে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চোরাই মাল পার হলেও মূল হোতারা কেন বারবার আড়ালে থেকে যায়, তার উত্তর লুকিয়ে আছে চোরাচালানের পরিভাষার ‘লাইন খরচ’ বা ‘টোকেন সিস্টেম’-এর মধ্যে। সেলিমের বিশ্বস্ত লাইনম্যানদের মূল কাজ হলো বিজিবি, পুলিশ বা স্থানীয় সোর্সদের মুভমেন্টের ওপর নজর রাখা। প্রতি বস্তা জিরা বা প্রতি কার্টন মাদকের জন্য সুনির্দিষ্ট রেট বা টোকেনের টাকা অগ্রিম নির্ধারিত থাকে। এই অবৈধ আর্থিক লেনদেনের টাকা স্থানীয় কিছু অসাধু চক্র এবং প্রভাবশালী মহলের পকেটে যায়, যার ফলে পণ্যবাহী গাড়িগুলো অনায়াসেই সীমান্ত পার হয়ে যায়।

আইনি ফাঁকফোকর ও কাস্টমস নিলামের অদ্ভুত চক্র: স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে জানান, চোরাচালানের পণ্য মাঝে-মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও এই সিন্ডিকেটের মূলের কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ হিসেবে তারা এক অদ্ভুত চক্রের কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে কাস্টমসের নিলাম প্রক্রিয়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি বিশেষ চক্রের মাধ্যমে কম দামে সেই জব্দকৃত পণ্য আবারও নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয় তারা। ফলে একই পণ্য বারবার বাজারে ঢুকছে, অন্যদিকে দামি আইনজীবী নিয়োগ করে এবং সরাসরি ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার না হওয়ার আইনি লুপহোল ব্যবহার করে প্রতিবারই পার পেয়ে যাচ্ছে গডফাদাররা।

প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান ও সচেতন মহলের আকুতি: বর্তমানে বিপুল পরিমাণ জিরা, কসমেটিকস এবং শ্রীপুর ক্যাম্পের বিজিবি টহল দল কর্তৃক উদ্ধারকৃত প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা মূল্যের ১৯৪টি দামি স্মার্টফোনের ঘটনার প্রেক্ষিতে জৈন্তাপুর মডেল থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক পৃথক নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে এবং সেলিমসহ পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনের মতে, কেবল মালামাল আটক বা বহনকারীদের গ্রেফতার করলেই এই সীমান্তকে নিরাপদ করা যাবে না। মরণনেশার হাত থেকে সিলেটের যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং দেশের অর্থনীতি সুরক্ষায় অবিলম্বে ‘ব্রয়লার সেলিম’, আমির ও জেবুসহ পুরো সিন্ডিকেটের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা প্রয়োজন। একই সাথে, এই জাতীয় শত্রুদের পেছনে থাকা রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সীমান্তবাসী।

কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, যুবদলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনকে কোনো অপরাধীর কারণে কলঙ্কিত হতে দেওয়া যাবে না। সীমান্ত চোরাচালান বা ভারতীয় চিনির সিন্ডিকেটের সাথে যুবদলের কোনো স্তরের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি একাধিক সাংগঠনিক সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন,“যুবদলে কোনো অপরাধী, চোরাকারবারি বা চাঁদাবাজের স্থান নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি সীমান্তে অবৈধ ব্যবসা বা সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করে, তবে তাকে শুধু দল থেকে বহিষ্কারই করা হবে না, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা হবে। প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে যেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আচরণ সুনির্দিষ্ট করার ওপর জোর দিয়েছেন। সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,“বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের মতো কোনো ধরনের লুটপাট, দখলবাজি কিংবা চোরাচালানের সিন্ডিকেট যুবদল বরদাশত করবে না। জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের মূল লক্ষ্য। দলের কোনো দায়িত্বশীল নেতা বা কর্মী যদি সীমান্ত চোরাচালানের সাথে দূরতম কোনো সম্পর্কও রাখেন, তবে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পদ স্থগিত বা বাতিল করা হবে। আমরা একটি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি উপহার দিতে চাই, কোনো অপরাধ চক্রের ঢাল হতে চাই না।”

জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জানিয়েছেন, সিলেট সীমান্তে ভারতীয় চিনি, প্রসাধনী ও মাদকসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জানিয়েছেন, চোরাচালানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা অপরাধী চক্রের হাতবদল যা-ই হোক না কেন, চোরাচালানের সাথে জড়িত ব্যক্তি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী হলেও তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সীমান্তের এই অবৈধ ব্যবসা চিরতরে বন্ধ করতে জেলা পুলিশ বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় রেখে যৌথ ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে সিলেট-তামাবিল ও ভোলাগঞ্জ-কোম্পানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল এবং চেকপোস্টের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য ও যানবাহন জব্দ করার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করা হচ্ছে।

রেঞ্জ ডিআইজি ড. মো: জিল্‌লুর রহমান যা বলেন, সীমান্তের চোরাচালান প্রতিরোধে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির (উপমহাপরিদর্শক) অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট। রেঞ্জ পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বৈঠকে ডিআইজি চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি সিলেটের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর পুলিশ সুপারদের (এসপি) কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন যেন সীমান্ত গলিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ পণ্য দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ডিআইজির স্পষ্ট বার্তা হচ্ছে, অপরাধী যেই হোক বা যে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করুক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি থানার পুলিশকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে কাজ করতে হবে। তবে উচ্চপর্যায়ের এই কঠোর নির্দেশনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এটি বাস্তবায়নে ডিআইজি কার্যালয় থেকে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও বিট অফিসারদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় কোনো অসাধু চক্র বা লাইনম্যানের সাথে প্রশাসনের কারও কোনো যোগসাজশ তৈরি হতে না পারে। ভারতীয় চিনি, মাদক, কসমেটিকস ও শাড়ি কাপড়ের মতো শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্যের চালান আটকাতে এবং বড় চোরাকারবারিদের আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ ও ডিবির বিশেষ টিমগুলোকে সক্রিয় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন রেঞ্জ ডিআইজি। অপরাধমুক্ত ও চোরাচালানমুক্ত সিলেট অঞ্চল গড়ে তুলতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থাকে তথ্যগত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে তাঁর।

সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় চিনি, মাদক, কসমেটিকসসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মালামাল অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বিজিবি সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করছে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোনো চোরাই পণ্য দেশের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। চোরাচালানের সাথে জড়িত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, বিজিবির কাছে কোনো অপরাধীর ছাড় নেই এবং চোরাকারবারি ও তাদের সহায়তাকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে বিজিবি বদ্ধপরিকর। সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত এই কর্মকর্তা আরও জানান যে, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় দিন ও রাতে বিজিবির বিশেষ টহল এবং চিরুনি অভিযান জোরদার করা হয়েছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চিনি ও অন্যান্য চোরাই পণ্য আটক করা সম্ভব হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান বন্ধ করা কেবল দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্যই নয়, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই লক্ষ্যে স্থানীয় সীমান্তসংলগ্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের চোরাচালান রোধে এগিয়ে আসার এবং চোরাকারবারিদের বিষয়ে বিজিবিকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।

বিভাগীয় টাস্কর্ফোসের সভায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, এদিকে সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আঞ্চলিক টাস্কফোর্স। গত ২১ মে ২০২৬ তারিখ সকাল ১০টায় সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মশিউর রহমানের সভাপতিত্বে এই সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গত ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী ১৯টি উপজেলা এবং ৬৪টি ইউনিয়নে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে শতভাগ টাস্কফোর্স সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই সভাগুলো যাতে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে চোরাচালান প্রতিরোধে এগুলো যেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য সীমান্তবর্তী উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের (ইউএনও) কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ, বিজিবি, কাস্টমস ও র‍্যাবের যৌথ সমন্বয়ে এই চোরাচালান বিরোধী সভার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিজিবি ও র‍্যাবের টহল এবং আকস্মিক যৌথ অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে চোরাচালান সংক্রান্ত বড় কোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত ঘটলে, তার কার্যবিবরণী ও প্রতিবেদন অবিলম্বে বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের প্রতিনিধি, বিজিবি সেক্টর কমান্ডার এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সীমান্ত চোরাচালান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিভাগীয় টাস্কফোর্সের এই সিদ্ধান্তগুলো একযোগে বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন।

সূত্র দৈনিক পর্যবেক্ষণ 

 


এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ