গোয়াইনঘাটে বালু খেকোদের তান্ডবে ধ্বংস হচ্ছে খেলার মাঠ ও বসতবাড়ি ফসলি জমি!
বিশেষ প্রতিবেদক:: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সদর ও ২ নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ প্রতাপপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। কখনও পেলোডার, কখনও ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় শত শত বিঘা ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের মুখে বিভিন্ন গ্রামের বসতঘর, হুমকির মুখে তিনটি ফুটবল খেলার মাঠ। শুধু প্রতাপপুর সীমান্ত এলাকাই নয়, জৈন্তাপুরের লালাখাল নদীতে অবৈধভাবে ও একই উপজেলার ইজারাধীন বড়গাঙ নদীতে শর্ত না মেনে চলছে বালু উত্তোলন।
প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেলের পিয়াইন নদীর অংশ আনন্দ খাল এলাকায় কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন। স্থানীয় ৪০-৫০ জনের একটি চক্র খাল এলাকার তীরে বালু উত্তোলন করায় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সে এলাকায় রয়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন তিনটি খেলার মাঠও। রয়েছে স্থানীয়দের বতবাড়ি, ফসলি জমি। কখনও দিনে কখনও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের মধ্যে লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ, দেলোয়ার হোসেন রয়েছেন।
একাধিক ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে রাতের আঁধারে টর্চলাইট জ্বালিয়ে শতাধিক লোকের বালু উত্তোলনের দৃশ্য। দিনের বেলায়ও মাঝেমধ্যে তাদের বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। সেই বালু কয়েকশ ট্রাক্টর ও ট্রাক দিয়ে সেখান থেকে অন্যত্র মজুতের পর বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন লক্ষাধিক ঘনফুট বালু সেখান থেকে উত্তোলন হয় বলে শ্রমিকরা জানিয়েছেন। এর বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকার বেশি। প্রতাপপুর ছাড়াও জৈন্তাপুর উপজেলার পৃথক নদী থেকে অবৈধভাবে আরও ৮০-৯০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর সিলেটের প্রকৃতিকন্যা জাফলং থেকে ব্যাপক হারে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করেছিল একটি চক্র। প্রতাপপুরে বালু উত্তোলনকারীদের অনেকে জাফলং ধ্বংসে জড়িত ছিল। তারা সেখানে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহার হয়। খায়রুল, কামরুলসহ অনেকের বিরুদ্ধে ২৫-৩০টি মামলা হয়েছে গত এক যুগে। তবে অধিকাংশ মামলা থেকে তারা রেহাই পেয়েছে কখনও আপস করে, কখনও বাদীকে চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করিয়ে। সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি খায়রুল, নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল। এতে তিনি ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনকালে বাধা দেওয়ায় মারধরের অভিযোগ করেন। এ ছাড়া সরকারি একাধিক কর্মকর্তাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে গত বছর ২৭ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে আবেদন করেন দক্ষিণ প্রতাপপুরের এমদাদুর রহমান। এতে তিনি বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজির অভিযোগসহ নদীর তীর ভাঙন ও বসতভিটা বিলীনের অভিযোগ করেন। একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের বিল্লাল হোসেন নামে আরেক ব্যক্তির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার রিপামনি দোবি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেন। এলাকাবাসীর পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক গত বছরের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে ফুটবল খেলার মাঠ ও মধ্যবর্তী স্থান থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আবেদন করেন। কিন্তু কোনো অভিযোগই বন্ধ করতে পারেনি বালু উত্তোলন। কখনও সরকারি জায়গা থেকে কখনওবা ব্যক্তিমালিকানার জায়গা থেকে উত্তোলন চলছেই।
স্থানীয়রা বলছেন, বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন লুনি ফুটবল মাঠ ও দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি ফুটবল মাঠ। লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের বাড়ি বর্ষা এলেই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ অনেকের বাড়ি রয়েছে হুমকির মুখে। শুধু দক্ষিণ প্রতাপপুর এলাকা নয়, এক কিলোমিটার দূরে পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজীপুর এলাকায় পিয়াইন নদীর বিভিন্ন অংশে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীতে চলে যাচ্ছে। বাড়িহারাদের মধ্যে হেলেনা বেগম, তরিক উল্লাহসহ কয়েকজন রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে খায়রুল আমিন বলেন, ‘বালু উত্তোলনে আমি জড়িত– এমনটি কেউ বলতে পারবে না। হাজীপুর বালুমহাল ইজারায় গেছে, তারা কীভাবে বালু উত্তোলন করবে, তারাই জানে। এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।’
গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বালু উত্তোলনে খায়রুলসহ অনেকে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, সম্প্রতি অভিযান চালানো হয়েছে। একটি মামলাও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান চলবে।
নিয়ম মানা হচ্ছে না বড়গাঙ নদীতে
জৈন্তাপুরের বড়গাঙ নদীর বালুমহালটি ইজারা নেন সানি-সোহা এন্টারপ্রাইজের পরিচালক চন্দন তালুকদার। পহেলা বৈশাখ থেকে নতুন করে চার কোটি টাকায় ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাতে চন্দনসহ নতুন করে অনেকে ইজারার অংশীদার হয়েছেন। এর আগেও ইজারার নীতিমালা না মেনে বালু উত্তোলন হয়েছে। নদীর উভয় পারের ন্যূনতম ১৫ মিটার জায়গা খালি রেখে নদী থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু আহরণ করার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। ঘুরেফিরে একই লোকজন ইজারায় জড়িত থাকায় নতুন ইজারায়ও একইভাবে উত্তোলনের আশঙ্কা রয়েছে। নিয়মবহির্ভূত বালু উত্তোলনের কারণে বড়গাঙ নদীর পাড়, ফসলি জমি, স্থানীয়দের বসতবাড়ি, কবরস্থান, শ্মশান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন ইজারার অংশীদার সিদ্দিক মিয়া বালু উত্তোলন বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে চাননি। এদিকে উপজেলার পর্যটন এলাকা লালাখাল নদী থেকেও বালু উত্তোলন চলছে। সেই নদীটি ইজারা না থাকলেও নানা কৌশলে বালু উত্তোলন করছে লোকজন। তাতে মদদ রয়েছে প্রভাবশালীদের।
জৈন্তাপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, বড়গাঙ নদীর তীর থেকে অনেক সময় বালু উত্তোলন করা হয়। আমরা সে বিষয়টি কঠোরভাবে ইজারাদারকে বলে আসছি। আইন লঙ্ঘন করলে অভিযান চালানো হয়। লালাখাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে রিটের কারণে ইজারা বন্ধ রয়েছে। মাঝেমধ্যে লোকজন চুরি করে বালু উত্তোলন করে। কয়েক মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা এবং বালু জব্দ করা হয়েছে।