পীরগাছায় ‘মব সন্ত্রাসে’ ৮ বাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ: এক বছরেও বিচার হয়নি, ক্ষতিপূরণের দাবি
স্টাফ রিপোর্টার ,:: রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় গুজব ছড়িয়ে হেযবুত তওহীদের সদস্যদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার এক বছর পূর্তিতে বিচারহীনতার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা।২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রংপুরের রিপোর্টার্স ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির রংপুর বিভাগীয় আমির আব্দুল কুদ্দস শামীম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পীরগাছা উপজেলার ২নং পারুল ইউনিয়নের ছিদামহাট এলাকায় তার বাড়িতে একটি পারিবারিক প্রীতিভোজের আয়োজনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হয়। ওই আয়োজনের বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, থানা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে স্থানীয় জামায়াতের কিছু নেতা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী বিষয়টিকে ভিন্নখাতে নিতে অপপ্রচার চালায় বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
তার দাবি, ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে পার্শ্ববর্তী নাগদহ এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে একদল লোক তার বাড়িতে হামলা চালায়। প্রথমে বাড়ির গেট ভেঙে ফেলা হয়, পরে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা করা হয়। এতে তিনি নিজে এবং প্রীতিভোজের প্রস্তুতিতে থাকা অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও হামলাকারীরা স্থানীয় মসজিদের মাইক ব্যবহার করে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দেয় এবং দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায় বলে অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হামলায় তার ও তার চার ভাইয়ের বসতবাড়িসহ মোট ৮টি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা চালানো হয়। অতিথিদের ২৩টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, ধান-চালসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগও করা হয়। এছাড়া ১২টি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
আহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনো চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানানো হয়। আবুল কালাম ও তসলিম উদ্দিন নামের দুজনের অবস্থা গুরুতর উল্লেখ করে তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। অনেক পরিবার এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি এবং কেউ কেউ ধারদেনা করে আংশিক ঘর মেরামত করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
আইনি অগ্রগতির বিষয়ে আব্দুল কুদ্দস শামীম বলেন, এ ঘটনায় মোট ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে আদালতে পাঁচটি মামলা এবং পীরগাছা থানায় একটি মামলা করা হয়। আদালতের মামলাগুলো তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে এক বছরেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই এবং থানায় দায়ের করা মামলায় এখনো চার্জশিট দাখিল হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে তিনটি ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ পাল্টা মামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান, ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পাল্টা মামলা প্রত্যাহার এবং আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তারা বলেন, “ধর্মকে ব্যবহার করে সংঘটিত এ ধরনের মব সন্ত্রাসের বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।” সরকারের উচ্চমহল, প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভুক্তভোগীরা দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।