জৈন্তাপুর সীমান্তের চোরাচালানের অ ভি যোগ, কোটি টাকার চালান জব্দ: সেলিমকে নিয়ে কী বললেন যুবদল সভাপতি ও প্রশাসন।
স্টাফ রিপোর্টারঃ সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তের কোটি টাকার চালান জব্দ, তবুও অধরা মূল হোতা: চোরাচালানের গডফাদার কে এই সেলিম’? সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলা। পাহাড়, হাওর আর ঐতিহাসিক জৈন্তা রাজবাড়ির সৌন্দর্যে ঘেরা এই শান্ত জনপদটি এখন গভীর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। গত চার মাস ধরে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের ব্যাপক তৎপরতায় একের পর এক জব্দ হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য, দামি স্মার্টফোন, কসমেটিকস এবং অভিনব কায়দায় লুকিয়ে রাখা মরণ নেশা মাদক। তবে একের পর এক চালান ধরা পড়লেও সীমান্তবাসীর কপালে চিন্তার ভাঁজ কমছে না।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেন, যুবদলের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনকে কোনো অপরাধীর কারণে কলঙ্কিত হতে দেওয়া যাবে না। সীমান্ত চোরাচালান বা ভারতীয় চিনির সিন্ডিকেটের সাথে যুবদলের কোনো স্তরের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি একাধিক সাংগঠনিক সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন,“যুবদলে কোনো অপরাধী, চোরাকারবারি বা চাঁদাবাজের স্থান নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি সীমান্তে অবৈধ ব্যবসা বা সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করে, তবে তাকে শুধু দল থেকে বহিষ্কারই করা হবে না, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা হবে। প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে যেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের আচরণ সুনির্দিষ্ট করার ওপর জোর দিয়েছেন। সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,“বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের মতো কোনো ধরনের লুটপাট, দখলবাজি কিংবা চোরাচালানের সিন্ডিকেট যুবদল বরদাশত করবে না। জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের মূল লক্ষ্য। দলের কোনো দায়িত্বশীল নেতা বা কর্মী যদি সীমান্ত চোরাচালানের সাথে দূরতম কোনো সম্পর্কও রাখেন, তবে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পদ স্থগিত বা বাতিল করা হবে। আমরা একটি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি উপহার দিতে চাই, কোনো অপরাধ চক্রের ঢাল হতে চাই না।
জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জানিয়েছেন, সিলেট সীমান্তে ভারতীয় চিনি, প্রসাধনী ও মাদকসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জানিয়েছেন, চোরাচালানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা অপরাধী চক্রের হাতবদল যা-ই হোক না কেন, চোরাচালানের সাথে জড়িত ব্যক্তি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী হলেও তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সীমান্তের এই অবৈধ ব্যবসা চিরতরে বন্ধ করতে জেলা পুলিশ বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় রেখে যৌথ ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে সিলেট-তামাবিল ও ভোলাগঞ্জ-কোম্পানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে পুলিশের টহল এবং চেকপোস্টের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিকদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য ও যানবাহন জব্দ করার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করা হচ্ছে।
রেঞ্জ ডিআইজি ড. মো: জিল্লুর রহমান যা বলেন, সীমান্তের চোরাচালান প্রতিরোধে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির (উপমহাপরিদর্শক) অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট। রেঞ্জ পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বৈঠকে ডিআইজি চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি সিলেটের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর পুলিশ সুপারদের (এসপি) কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন যেন সীমান্ত গলিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ পণ্য দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ডিআইজির স্পষ্ট বার্তা হচ্ছে, অপরাধী যেই হোক বা যে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করুক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি থানার পুলিশকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে কাজ করতে হবে। তবে উচ্চপর্যায়ের এই কঠোর নির্দেশনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এটি বাস্তবায়নে ডিআইজি কার্যালয় থেকে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও বিট অফিসারদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় কোনো অসাধু চক্র বা লাইনম্যানের সাথে প্রশাসনের কারও কোনো যোগসাজশ তৈরি হতে না পারে। ভারতীয় চিনি, মাদক, কসমেটিকস ও শাড়ি কাপড়ের মতো শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্যের চালান আটকাতে এবং বড় চোরাকারবারিদের আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ ও ডিবির বিশেষ টিমগুলোকে সক্রিয় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন রেঞ্জ ডিআইজি। অপরাধমুক্ত ও চোরাচালানমুক্ত সিলেট অঞ্চল গড়ে তুলতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বিজিবিসহ অন্যান্য সংস্থাকে তথ্যগত সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে তাঁর।
সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় চিনি, মাদক, কসমেটিকসসহ যেকোনো ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মালামাল অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বিজিবি সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করছে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোনো চোরাই পণ্য দেশের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। চোরাচালানের সাথে জড়িত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, বিজিবির কাছে কোনো অপরাধীর ছাড় নেই এবং চোরাকারবারি ও তাদের সহায়তাকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে বিজিবি বদ্ধপরিকর। সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত এই কর্মকর্তা আরও জানান যে, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় দিন ও রাতে বিজিবির বিশেষ টহল এবং চিরুনি অভিযান জোরদার করা হয়েছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চিনি ও অন্যান্য চোরাই পণ্য আটক করা সম্ভব হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান বন্ধ করা কেবল দেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্যই নয়, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই লক্ষ্যে স্থানীয় সীমান্তসংলগ্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের চোরাচালান রোধে এগিয়ে আসার এবং চোরাকারবারিদের বিষয়ে বিজিবিকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো.
স্থানীয় প্রভাবশালী চোরাচালান চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। গোপন সংবাদে পুলিশের বিশেষ অভিযান পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় জিরার একটি বড় চালান অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জৈন্তাপুর মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোঃ উসমান গনীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল মাঠে নামে। উপজেলার একটি কৌশলগত পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৭৫ বস্তা ভারতীয় জিরা উদ্ধার করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যাওয়ায় ঘটনাস্থল থেকে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। জব্দকৃত জিরার বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে এবং এই চোরাচালানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে বলে থানা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এদিকে, সীমান্ত এলাকার একাধিক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি জব্দ হওয়া জিরার এই বিশাল চালানটি দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে দাপিয়ে বেড়ানো আলোচিত চোরাচালান ব্যবসায়ী সেলিম আহমেদ ওরফে ‘ব্রয়লার সেলিম’-এর সিন্ডিকেটের।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ নিজাম উদ্দিন, নির্বাহী সম্পাদক : আইয়ুব আলী অফিস ; খান কমপ্লেক্স, সোনারপাড়া, শিবগঞ্জ, সিলেট। যোগাযোগ : প্রকাশক ও সম্পাদক : ০১৭৩৭-৩০৪৭৫১। ই-মেইল : sylhetbuletin@gmail.com
All rights reserved © 2025 sylhet buletin