মাজারের স্বচ্ছতা নাকি সিন্ডিকেটের কোটি টাকার মিশন? সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমের বিদায়ে কেন উত্তাল সিলেট !
সিলেট বুলেটিন অনলাইন ডেক্স:: **"১০ কোটি নয়, ১০ হাজার কোটি টাকা দিয়েও আমাকে কেনা যাবে না"** বুক চিতিয়ে এই ঘোষণা দেওয়া সিলেটের সাহসী, সৎ ও আপসহীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে আকস্মিক প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ সিলেটের রাজপথ। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সৎ এই কর্মকর্তার বদলি প্রত্যাহারের দাবিতে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে রাস্তায় নেমে এসেছেন সাধারণ মানুষ। সরকারিভাবে একে 'নিয়মিত বদলি' বলা হলেও, সচেতন নাগরিক সমাজ তা মোটেও মেনে নিতে পারছেন না। কোনো স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তার নাম ঘোষণা না করেই, রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করে সোমবারের মধ্যেই কেন তাকে জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলো? এই তাড়াহুড়ো আর রহস্যের পেছনে আসলে কী লুকিয়ে আছে?
★চলুন দেখে নেওয়া যাক, কেন ডিসি সারওয়ার আলমকে সরাতে এতোটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল সিলেটের কোটি কোটি টাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেট:
ঊর্ধ্বতন সরকারি আদেশ বনাম ‘বলির পাঁঠা’ রাজনীতি: ডিসি সারওয়ার আলম নিজের একক সিদ্ধান্তে বা আবেগের বশে হুট করে মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যাননি। মূলত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে এই দায়িত্ব দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছিল। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ তামিল করেছেন মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার যদি মাজারের দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা দূর করার এই মিশন শেষই না করতে পারবে, তবে ডিসিকে এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে কেন মাঝপথে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হলো? এই রহস্যজনক পিছুটান প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ের সৎ কর্মকর্তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পরে সিন্ডিকেটের স্বার্থে তাদের সহজেই কোরবানি দেওয়া হয়।
সরকার বদল ও ‘শেয়ার’ বণ্টনের গোপন সমঝোতা গেম!
ঘটনার আসল মাজেজা হয়তো মাজারের টাকা বাঁচানো নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই টাকার ‘ভাগ-বাটোয়ারা’ পুনঃনির্ধারণ করা। সরকার বদলের সাথে সাথে সব জায়গার দখলদারিত্বের চেহারা বদলালেও মাজারের খাদেম গোষ্ঠী হয়তো সহজে নতুনদের হিসেব বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছিল না। আর তাই মাজারওয়ালাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং টেবিলে বসাতে এই ‘গোলমাল’ বাধানোটা খুব জরুরি ছিল। এই সাজানো গেমের নিখুঁত চাল হিসেবে ডিসিকে ব্যবহার করে মাঠ গরম করা হয়েছে। অতঃপর পর্দার আড়ালে নতুন করে কারা মাজারের টাকার ভাগ বাটোয়ারার তালিকায় যুক্ত হলেন, আর কী গোপন সমঝোতা হলো তা নিয়ে এখন জন্ম নিয়েছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।
‘ফাটাকেষ্ট’ স্টাইলে অ্যাকশন ও অপরাধীদের পিছুটান
সিলেটে যোগদানের পর থেকেই ডিসি মো. সারওয়ার আলম একের পর এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসেন। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা তার কাজের ধরনের কারণে তাকে বলিউডের জনপ্রিয় ‘ফাটাকেষ্ট’ চরিত্রের সাথে তুলনা করছেন।
যোগদানের পরপরই তিনি নিজের আত্মীয়স্বজনসহ সবার জন্য সব ধরনের অবৈধ তদবির ও জেলা প্রশাসকের বাসভবনে যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর তিনি হাত দেন সিলেটের দীর্ঘদিনের জমে থাকা জঞ্জালে। ফুটপাত হকারমুক্ত করা, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং বিল-জলমহাল শাখার বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি দমনে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। তার এই আপসহীন মনোভাবের কারণে সিলেটের প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছি
২০০ কোটির পাথরখেকো সিন্ডিকেটের দুর্গ ভাঙন
সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জের 'সাদা পাথর' এলাকা থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে তিনি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেন। পরিবেশ ধ্বংসকারী এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছিল। ডিসি সারওয়ার আলম জাফলং এলাকার শতাধিক অবৈধ ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং প্রায় **২০০ কোটি টাকার পাথর লুটপাট চক্রের** আধিপত্য এক ঝটকায় বন্ধ করে দেন। এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সিলেটের বড় বড় গডফাদাররা।
শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজারকাণ্ড: স্বচ্ছতার লড়াই
ডিসি সারওয়ার আলমের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার দান-অনুদানকে যারা যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের 'পৈত্রিক সম্পত্তি' মনে করে ভোগ করে আসছিল, সেই প্রভাবশালী খাদেমদের বিরুদ্ধে তিনি একশনে নামেন।
মাজারের টাকার সঠিক ও স্বচ্ছ হিসাব জনসম্মুখে আনার উদ্যোগ নিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মাজারের একটি প্রভাবশালী মহল। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, ডিসিকে ঠেকাতে দরগা গেটের একটি আবাসিক হোটেলে সাংবাদিকদের নিয়ে গোপন বৈঠকও করে মাজারের খাদেমদের একটি অংশ। মাজারের পক্ষে সাফাই গাইতে এবং ডিসির স্বচ্ছতার উদ্যোগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে বিশাল ফান্ড গঠন করা হয়। কিন্তু কোনো চাপের মুখেই পিছু হটেননি এই সাহসী কর্মকর্তা।
বদলির পেছনে ১০ কোটি টাকার ‘সিন্ডিকেট মিশন’?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মুহূর্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা হলো ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে সরাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকার মিশন।
ডিসির কঠোর অবস্থানের কারণে পাথর কোয়ারীগুলো বন্ধ থাকায় এবং অবৈধ আয়ের দুর্গ ভেঙে পড়ায় গত নভেম্বর মাস থেকেই তাকে বদলি করার জন্য একটি মহল মরিয়া হয়ে উঠেছিল। বালু-পাথর খেকো, চোরাকারবারি, জালিয়াত চক্র এবং আবাসন দখলদারেরা দরগা মহল্লার একটি অভিজাত হোটেলে গোপন বৈঠক করে। দাবি করা হচ্ছে, ঢাকা মহলে তদবির করে ডিসিকে সিলেট থেকে বদলি করার জন্য **প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি বিশাল ফান্ড বা বাজেট** গঠন করা হয়েছিল। সর্বশেষ মাজারের ঘটনাটিকে পুঁজি করে সেই সংঘবদ্ধ চক্রটি সফল হয় এবং কয়েক কোটি টাকার চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পায় বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে ফেসবুকে দাবি করা হচ্ছে।
জনসেবা ও নগর উন্নয়নে অনন্য রেকর্ড
তিনি শুধু উচ্ছেদ বা অভিযানই চালাননি, বরং সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে হাত দিয়েছিলেন:
* **স্বাস্থ্য খাতের শুদ্ধি অভিযান:** সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দীর্ঘদিনের ওষুধ চোর, দালাল সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অভিযান চালান এবং ওসমানী মেডিকেলে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল চালুর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন।
* **সরকারি জমি উদ্ধার ও ‘প্রবাসী পল্লী’:** আবাসন প্রকল্প বা প্রভাবশালী মহলের জবরদখলকৃত শত শত একর সরকারি খাস জমি তিনি উদ্ধার করেন। প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ৩ হাজার বিঘা জমিতে একটি আধুনিক ‘প্রবাসী পল্লী’ গড়ে তোলার দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
* **জননিরাপত্তা:** নগরীর ২৬টি বা তার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা নগরবাসীকে এক বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতো।
সিলেটের প্রভাবশালীদের ‘রহস্যজনক নীরবতা’
এই পুরো নাটকীয় ঘটনার পেছনে সিলেটের রাজনৈতিক মহলের ভূমিকা নিয়েও ফেসবুকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নেটিজেনরা। সাধারণ মানুষের স্পষ্ট অভিযোগ যখন একজন সৎ কর্মকর্তা সিলেটের অপরাধী, চোরাকারবারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে যাচ্ছিলেন, তখন সিলেটের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের এই রহস্যজনক নীরবতা মূলত সিন্ডিকেটকে আরও বেশি সাহস ও সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে।
! ডিসি সরওয়ার আলমের বদলি নিয়ে সিলেট উত্তাল হলেও সিলেটের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রীর নীরবতা সাধারণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাহলে কি ডিসি বদলির পিছনে এই দুই মন্ত্রীর কারো কোন হাত বা ইশারা আছে এমন প্রশ্ন ফেসবুকে শোভা পাচ্ছে। সিলেটবাসির প্রশ্ন?
🌧️ সিলেটবাসীর নজিরবিহীন ভালোবাসা
ডিসি সারওয়ার আলমের এই অন্যায় প্রত্যাহারের আদেশ সিলেটবাসী মুখ বুজে মেনে নেয়নি। বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, তীব্র বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। সরকারি কোনো আমলা বা কর্মকর্তার বদলি ঠেকাতে সিলেটের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের এমন ঢল এবং চোখের জল সত্যিই নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক।
প্রতিক্রিয়া :
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একে "স্বাভাবিক ও নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়া" বললেও সিলেটের সচেতন জনতা তা ভালো করেই বোঝে—এটি আসলে সততার ওপর সিন্ডিকেটের টাকার পাহাড়ের আঘাত।
ডিসি মো. সারওয়ার আলম হয়তো সরকারি আদেশে সিলেট ছেড়ে চলে যাবেন, কিন্তু সিলেটের মানুষের মনে তিনি যে সততা ও সাহসের স্থান করে নিয়েছেন, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ফেসবুকজুড়ে এখন সচেতন নাগরিকদের একটাই দাবি—**সিন্ডিকেটের জয় আর সততার পরাজয়ের এই নোংরা সংস্কৃতি বাংলাদেশে বন্ধ হোক। আমরা ডিসি সারওয়ার আলমের বদলির আদেশ প্রত্যাহার চাই!**
**আপনার মতামত কী? কমেন্টে জানান এবং শেয়ার করে সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন করুন।**
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ নিজাম উদ্দিন, নির্বাহী সম্পাদক : আইয়ুব আলী অফিস ; খান কমপ্লেক্স, সোনারপাড়া, শিবগঞ্জ, সিলেট। যোগাযোগ : প্রকাশক ও সম্পাদক : ০১৭৩৭-৩০৪৭৫১। ই-মেইল : sylhetbuletin@gmail.com
All rights reserved © 2025 sylhet buletin