সরকারি সুবিধার নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ? গোড়গ্রামে গ্রাম পুলিশ মিনহাজকে ঘিরে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
নীলফামারী প্রতিনিধি: নীলফামারী সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মোঃ মিনহাজুল ইসলাম মিনহাজের বিরুদ্ধে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে টাকা নেওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সরকারি সুবিধা বা ভাতার কার্ড পাননি ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, গোড়গ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় মিনহাজের কাছে টাকা দেন। কেউ ধারদেনা করে, আবার কেউ সুদে টাকা এনে তার হাতে তুলে দেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সুযোগ ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়ার পর মাসের পর মাস পার হলেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী কোনো সুবিধা পাননি। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে যোগাযোগও কমিয়ে দেন অভিযুক্ত মিনহাজ। জাকারিয়া ইসলামের স্ত্রী আকলিমা আক্তারের কাছ থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ৪ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে শামসুন্নাহারের কাছ থেকে বিধবা ভাতার জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা, লতিফা বেগমের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং লাভলী বেগমের কাছ থেকেও ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৪ লক্ষাধিকের বেশি টাকা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী রাহাত ইসলাম বলেন, আমার মায়ের বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে মিনহাজ ৩ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছে। শুধু আমাদের কাছ থেকেই নয়, এলাকার অনেক অসহায় মানুষের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ কোনো সুবিধা পায়নি। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ইউনিয়ন পরিষদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে মিনহাজ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অর্থ বাণিজ্য পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মিনহাজের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। এছাড়াও স্থানীয় কিছু মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। মিনহাজ অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত। তবে এলাকাবাসীর দাবি, এসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এলাকায় একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে, যার কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেন না।
একজন গ্রাম পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনসেবামূলক কাজে সহযোগিতা করা, তাদের বিরুদ্ধেই যদি দুর্নীতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুক্রবার (১৫ মে ২০২৬) বিকেলে কয়েকজন ভুক্তভোগী টাকা ফেরত ও জবাবদিহি চাইতে মিনহাজুল ইসলাম মিনহাজের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।