অবশেষে বদলী ডিসি অফিসের সেই কোটিপতি কর্মচারি
সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক সোহেল আহমদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, ঘুষ, জালিয়াতি ও সরকারি জলমহাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকার মানহানি মামলার হুমকি দিয়ে হাইকোর্টের উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। উকিল নোটিশে তিন দিনের মধ্যে সংবাদটির প্রতিবাদ প্রকাশ ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সচেতন মহলের প্রশ্ন ডিসি অফিসের একজন অধস্তন কর্মচারী কোন ক্ষমতা বলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা হুমকি দেন? জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই কি তিনি এই উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন? এদিকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত ৮ জানুয়ারি এক আদেশে সোহেল আহমদকে রাজস্ব শাখা থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। সিলেট জেলা বারের একাধিক আইনজীবি জানান, সরকারি বিধি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কোনো অধস্তন কর্মচারীর মামলা করার এখতিয়ার নেই। তবে তিনি হয়তো দীর্ঘদিনের তার করা অপকর্ম ঢাকতেই তিনি আইন বহি:ভূত ভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোটি টাকার মানহানি মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। যা সরকারির চাকরির বিধি লঙ্গন করেছেন বলে প্রতিয়মান হয়।
এদিকে সিলেট জেলা বার আইনজীবি সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল হেলাল বলেন, সাংবাদিকরা বিভিন্ন ভাবে হয়রানী হওয়া সমিতির প্রতিনিধি কর্তৃক জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার অফিসে দাখিল করা অভিযোগের আলোকে ডিসি অফিসের রাজস্ব শাখার অফিস সহকারির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সংবাদ পরিবেশন করেছেন। যার সত্য মিথ্যা যাচাই করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে। এরমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও যথাযথ মাধ্যম ছাড়া একজন সরকারি ৩য় শ্রেনীর ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী কি করে পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ১ কোটি টাকার মানহানির মামলার হুমকি দেয় তা আমার বোধগাম্য নয়। এটা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্তি। নিজের অপকর্ম ঢাকতে মহামান্য হাইকোর্টের উকিল দিয়ে পত্রিকা অফিসে উকিল নোটিশ প্রেরণ করেছেন কি না তাও খতিয়ে দেখতে হবে।
সিনিয়র আইনজীবি এড,মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, একজন ৩য় শ্রেণীর ১৬ তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী তার বিরুদ্ধে কোন সংবাদের প্রতিবাদ প্রেরণ করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মচারি তা মান্য করেনি। তিনি যে লিগ্যাল নোটিশটি উকিলের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন, “যে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে প্রতিবাদ প্রকাশ না করলে ১ কোটি টাকার মানহানি মামলা করবেন। এটি হুমকি স্বরোপ অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। যা প্রচলিত আইনতো অপরাধ হিসাবে গন্য হবে? এখন উনার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। মামলা সংক্রান্ত এমন কিছু হলে সংশ্লিষ্ট সম্পাদক ও সাংবাদিক আইনী ভাবে পর্যাপ্ত তথ্য প্রামান দিয়ে মোকাবেলা করবেন।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সিলেট জেলা প্রতিনিধি মো: নুরুল ইসলাম গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং তারিখে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সোহেল আহমদ ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই রাজস্ব শাখায় প্রভাব বিস্তার করে সরকারি বিল, জলমহাল, খাস-কালেকশন, ইজারা ও বন্দোবস্ত প্রক্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। অভিযোগে বলা হয়, সিলেট সদর উপজেলার পশ্চিম চৌখিদিঘী রংধনু আবাসিক এলাকার ১২০/২ নম্বর বাসার বাসিন্দা সোহেল আহমদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জেলার মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মানুষজন কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ দেড় যুগ থেকে সিলেট ডিসি অফিসের রাজস্ব শাখার অফিস সহকারি হিসাবে কর্মরত থেকে জেলার সকল সরকারি বিল ও জলমহালের ইজারা, বন্দোবস্ত, খাসকালেকশনের নামে লুটপাটের মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
তার কথামতো ঘুষের টাকা বাসায় পৌঁছে দিলে কিংবা তাকে বিল বা জলমহালে অংশীদার করলে জাল কাগজে সৃষ্ট সমিতির নামে ইজারা ও বন্দোবস্ত পাইয়ে দিতেন তিনি। নুরুল ইসলাম অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, বিভিন্ন বিতর্কিত ও কাগুজে সমিতির সঙ্গে অংশীদার হয়ে সোহেল আহমদ সরকারি বিল ও জলমহালের ইজারা, লিজ ও বন্দোবস্ত দিয়ে ব্যাপক মৎস্য লুটপাট চালিয়ে আসছেন। এর ফলে প্রকৃত ও বৈধ মৎস্যজীবী সমিতিগুলো বঞ্চিত হচ্ছে এবং সরকারি সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭৮টি বিল ও জলমহালকে মামলাভুক্ত দেখিয়ে খাস-কালেকশনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রকৃত দরদাতা সমিতিকে ইজারা বা বন্দোবস্ত না দিয়ে নিজের সঙ্গে আতাঁত করা সমিতিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগে বলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সদর উপজেলার সর্বানন্দ মৌজার মেলানবিল, মাকুলিবিল, দক্ষিণ সুরমার হাওয়াচোরা বিল, গোয়াইনঘাটের খাগড়িঢিগাগ্রুপ জলমহাল, কানাইঘাটের বড় হাওর, সদর উপজেলার হাকুলি-মাকুলি বিলসহ অন্তত ৪০টির বেশি বিল ও জলমহাল অবৈধভাবে লুটপাট করা হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে সরকারি বিল ও জলমহালের শত শত একর জমি জবরদখলে চলে গেছে। এছাড়া স্থানীয় সাংবাদিকরা এসব অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে বিভিন্ন সময় বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল আলম নাদেলের রাজনৈতিক ভয় ও প্রশাসনিক প্রভাবের ভয় দেখিয়ে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে সোহেল আহমদের বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগে মো: নুরুল ইসলাম সোহেল আহমদের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, জাল কাগজে সৃষ্ট সমিতির মাধ্যমে দেওয়া সকল অবৈধ ইজারা বাতিল, মামলাভুক্ত দেখিয়ে আটকে রাখা বিল ও জলমহাল মামলামুক্ত করে প্রকৃত দরদাতা সমিতির কাছে ইজারা প্রদান এবং জবরদখলকৃত সরকারি জমি উদ্ধারের জন্য দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রতিশ্রুতি সমিতির সভাপতি সাহেদ আহমদ বিভাগীয় কমিশনার, সিলেট ও জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া পৃথক লিখিত অভিযোগে অভিযোগ করেন, সরকারি কোনো জলমহাল ইজারা বা লিজ নিতে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলেও সোহেল আহমদকে ঘুষ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারলে প্রকৃত ও সর্বোচ্চ দরদাতা সমিতিকে বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল দেখিয়ে ইজারা দেওয়া হয় না। সাহেদ আহমদের অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি বিল ও জলমহাল ইজারার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি জড়িত এবং তারা সরকারি জলমহাল নীতিমালা ২০০৯ লঙ্ঘন করে ইচ্ছেমতো বিতর্কিত ও কাগুজে সমিতির অনুকূলে ইজারা প্রদান করছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এসব ইজারার ক্ষেত্রে সমবায় আইন ২০০১ (সংশোধিত) এর একাধিক ধারা প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, ধারা ২৮(১): অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত থাকা, ধারা ৩৮(২): মিথ্যা তথ্য ও জাল নথি প্রদান, ধারা ৪৩ ও ৪৭: বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং সমিতির কার্যক্রম বাতিলের বিধান। আইনে এসব বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন না করে বিতর্কিত সমিতির অনুকূলে বিল ও জলমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব অনিয়মের সঙ্গে সোহেল আহমদ সরাসরি জড়িত বলেও অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের শুনানী আগামী ১৩ জানুয়ারী অনুষ্টিত হবে বলে সাহেদ জানান। ভুয়া কাগজ দেখিয়ে জলমহাল বঞ্চনা : সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সরকারি জলমহাল ইজারাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে এক কর্মকর্তা সোহেলের বিরুদ্ধে। বিগত প্রায় এক দশক ধরে একাধিক মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি অভিযোগ করে আসছে ঘুষ নেওয়া হলেও ইজারা দেওয়া হয়নি, আবার ভুয়া বা বিতর্কিত কাগজ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার প্রশাসনে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিলেও কিন্তু তদন্তে কোন অগ্রগতি মিলেনি, সবশেষ ১৯ মার্চ ২০২৩ তারিখে সোহেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার আশার আলো মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি নিজাম উদ্দিন। অভিযোগটি ২০ মার্চ ২০২৩ তারিখে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।
এর আগেও ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর একই ধরনের অভিযোগ করেন নিজাম উদ্দিন ও সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রহমত আলী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ ও ২০১৪ অর্থবছরে গোলাপগঞ্জ উপজেলার শৈলেশ্বর এলাকার দুটি বিল ইজারা নিতে আবেদন করে ভাদেশ্বর সালিম শাহ মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফটিক মিয়ার কাছ থেকে সোহেল ইজারা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে ঘুষ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ উঠলেও শেষ পর্যন্ত বিল দুটি ইজারা দেওয়া হয়নি।
একই কাগজ, ভিন্ন সময় প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত : পরবর্তীতে ২০২৩ সালে পুনরায় আবেদন করলে সোহেল একটি পুরনো কাগজ দেখিয়ে আবেদন নাকচ করেন। ওই কাগজটি হলো স্মারক নং ৩১.০০.০০০০.০৫০.৫৯.০৮১.১২.৬৩৩, তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০১৯। আশ্চর্যের বিষয়, একই কাগজ এর আগেও আশার আলো মৎস্যজীবি সমবায় সমিতিকে দেখিয়ে তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছিল। ওই স্মারকে উল্লেখ ছিল “সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলাধীন শলেম্বর বিল ও বিল ডোবা জলমহাল দুটি সেনাবাহিনীর অনুকূলে অকৃষি খাসজমি হিসেবে বন্দোবস্ত প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় আবেদন নামঞ্জুর করা হলো।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র: তবে অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার স্মারক নং ০৫.৪৬.৯১০০.০০৮.৩২.১৫৪.১১-২৬৬৮(২), তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি জলমহাল ইজারা প্রদান সংক্রান্ত কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য জানা যায়নি। তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার এলাকার বাসিন্ধা, নতুনকুড়ি মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য ছায়াদ মিয়া অভিযোগ করেছেন, সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার হাওয়াচেরা বিল ইজারা প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারী সোহেল আহমদ। এ ঘটনায় বাধ্য হয়ে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং ৪০১/২০২৫ ইং। আদালতে তার পক্ষে বিল ইজারা দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা আমলে নিচ্ছেনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সোহেল আহমদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত সর্বশেষ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সিলেট জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করেন জুলাইযুদ্ধা গুলিবিদ্ধ আহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক কামাল হোসেন মিঠু (গেজেট নং৩৭৩৮৫)। তিনি অভিযোগের অনুলিপি দুদক সিলেট অফিসেও জমা দেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ডিসি অফিসের রাজস্ব শাখার সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (পিয়ন) সোহেল আহমদ গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় কর্মরত থেকে জেলার সরকারি বিল ও জলমহালের ইজারা, লিজ ও বন্দোবস্তের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। বিগত ১৭ বছর ধরে জেলার শত শত একর সরকারি বিল ও জলমহালের জমি বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে জবরদখলে সহযোগিতা করে সরকারি সম্পদ বেহাত করা হয়েছে। সোহেল আহমদ বিভিন্ন বিতর্কিত সমবায় সমিতির সঙ্গে আঁতাত করে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রদান করে মৎস্য সম্পদ লুটপাটে জড়িত বলে অভিযোগে বলা হয়। জেলার মৎস্যজীবী সমিতির সদস্যদের জিম্মি করে ঘুষ ছাড়া সঠিক দরদাতা সমিতিকে ইজারা না দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। তিনি সহ কয়েকজন সাংবাদিক সরেজমিন অনুসন্ধান করে দেখেন , ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রকৃত দরদাতা সমিতির দরপত্র বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করা হয়। আর ঘুষ বা অংশীদারিত্ব দিলে কাগুজে সমিতিকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন সোহেল। এর ফলে সরকার প্রতিবছর প্রায় ২০ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭৮টি বিল ও জলমহল মামলাভুক্ত দেখিয়ে খাসকালেকশনের নামে দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রকৃত দরদাতাদের ইজারা না দেওয়ার পাঁয়তারা করা হয়েছে। চলতি বছরে খাসকালেকশন ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেওয়া প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি বিল সরেজমিন পরিদর্শনে সরকারি ১নং খতিয়ানের জমি জবর দখলের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানান অভিযোগকারী সাংবাদিক। বিগত দুই বছর থেকে লুটপাট হচ্ছে সর্বনন্দ মৌজার মেলান বিল। যা এবছরও চলমান রয়েছে। জেলার গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলার একাধিক সরকারি বিলে দীর্ঘদিন ধরে জবর দখল চলছে বলে অভিযোগ উঠে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় প্রভাবশালী নেতা শফিউল আলম নাদেলের হয়ে কাজ করতেন সোহেল আহমদ।
বর্তমানে তিনি জেলা প্রশাসকের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। সোহেল আহমদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে সাংবাদিকদের হুমকি, উকিল নোটিশ ও মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কোনো অধস্তন কর্মচারীর মামলা করার এখতিয়ার নেই— তবুও সোহেল আহমদ এসব ক্ষমতা কীভাবে পাচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারী সোহেল আহমদকে অবিলম্বে অন্যত্র বদলি, তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান, জবরদখলকৃত সরকারি বিল উদ্ধার এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী সরকারের শাসনামলে এমন দুর্নীতি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য তাকে জেলার কোম্পানীগঞ্জ থানায় বদলী করা হয়েছে।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: একই জলমহাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে একই কাগজ দেখিয়ে একাধিক মৎস্যজীবি সমিতির আবেদন বাতিল এবং জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের সঙ্গে সেই কাগজের তথ্যের অসামঞ্জস্যতা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
মৎস্যজীবিদের দাবি: ভুক্তভোগী মৎস্যজীবি সমিতিগুলোর দাবি, অবিলম্বে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত মৎস্যজীবিদের স্বার্থ রক্ষা করতে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র দৈনিক পর্যবেক্ষণ